টেকসই নীতিমালার আলোকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার বাড়ানো গেলে বাংলাদেশে বড় ধরনের উন্নয়ন সম্ভব। এমনকি এআইভিত্তিক শিল্প গড়ে তুললে জ্বালানি খরচসহ অনেক কিছুর খরচ কমে আসবে। লাভবান হবে দেশের জনগণ।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) রাজধানীর চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এবং চীনের প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ টেককানেক্ট-২০২৬’ শীর্ষক সম্মেলনে বক্তারা এ কথা বলেন। তারা বলেন, বাংলাদেশ জনসংখ্যা এবং পরিবেশের দিক দিয়ে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন। তাই এই দেশের প্রেক্ষাপট চিন্তা করে অবকাঠামো তৈরি করে সেবা দিতে হবে। এই অনুষ্ঠানে এআই ব্যবহার করে কীভাবে স্কুলে ছাত্রদের শিক্ষা ব্যবস্থার অবকাঠামো তৈরি, বাসাবাড়িতে রোবট ব্যবহার এবং সবুজ জ্বালানির আধুনিক প্রযুক্তির বিভিন্ন ডিভাইসও প্রদর্শন করা হয়। বলা হয়, শুধু প্রযুক্তির ব্যবহারকে বিশ্বাসযোগ্য করতে নিরাপদ ইন্টারনেট বা এআই ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য সাইবার সিকিউরিটির ভিত মজবুত করার বিকল্প নেই। সম্মেলনে সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলেন, নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকার একটি এআই নীতিমালা তৈরি করছে। আগামী ৩/৪ মাসের মধ্যে এটি চূড়ান্ত করা হবে।
মঙ্গলবার এ আয়োজন উদ্বোধন করেন ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। এরপর সাইবার সিকিউরিটি, কানেক্টিভিটি ও ডিজিটাল সেবা নিয়ে আলাদাভাবে আলোচনা হয়।
টেলিযোগাযোগমন্ত্রী বলেন, সরকার ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির আলোকে একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও জ্ঞানভিত্তিক বাংলাদেশ গড়তে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ নীতির ওপর ভিত্তি করেই আগামী ৫ বছরে ডিজিটাল খাতে ১০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাংলাদেশকে তথ্যপ্রযুক্তি ও এআইয়ের আঞ্চলিক কেন্দ্রে পরিণত করতে কাজ করা হচ্ছে। মন্ত্রী বলেন, দেশের প্রতিটি অঞ্চলে নির্ভরযোগ্য, নিরাপদ, উচ্চগতির ও সাশ্রয়ী ডিজিটাল সংযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। এ লক্ষ্যে আধুনিক টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়ন, ডিজিটাল দক্ষতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দেশীয় উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, একই সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা ও প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে করে জনগণের প্রাইভেসি নিশ্চিত করা যায়। এতে করে জনগণ তথ্যপ্রযুক্তির ওপর বিশ্বাস হারাবেন না। তিনি বাংলাদেশের উন্নয়নে চীন এবং বিশেষ করে হুয়াওয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, এই দেশে প্রযুক্তি প্রসারে হুয়াওয়ের অবদান আছে।
টেলিযোগাযোগ সচিব ড. মো. কামরুজ্জামান বলেন, নতুন নতুন প্রযুক্তির যোগাযোগ বা কানেক্টিভিটির অবশ্যই একটি মূল্য থাকতে হবে, যাতে জনগণ উপকৃত হয়। তিনি বলেন, নতুন নতুন প্রযুক্তি আসছে। সেই প্রযুক্তির অবশ্যই যৌক্তিক দাম থাকতে হবে। তিনি বলেন, ডিজিটাল অবকাঠামো এখন আর বিলাসিতা নয়; বরং সমৃদ্ধ, বিনিয়োগনির্ভর ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলার অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা বলেন, দেশের ডিজিটাল রূপান্তর ত্বরান্বিত করতে সরকার পাঁচটি কৌশল নির্ধারণ করেছে। এগুলো হলো—শক্তিশালী ও বিনিয়োগবান্ধব আইন প্রণয়ন, ডিজিটাল পাবলিক অবকাঠামো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সাইবার নিরাপত্তা এবং দেশীয় উৎপাদন।
তিনি জানান, একটি জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে। আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে সম্পন্ন করার আশা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, নাগরিকদের একক নম্বর বা আইডি দিয়ে সেবা দিতে সরকার কাজ করছে। এ জন্য ‘ওয়ান সিটিজেন-ওয়ান ওয়ালেট’ সুবিধা দিতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
হুয়াওয়ের দক্ষিণ এশিয়ার প্রেসিডেন্ট জেসন উ বলেন, বাংলাদেশের ডিজিটাল অবকাঠামোর উন্নয়ন ও প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণে হুয়াওয়ে, সরকার এবং শিল্পখাতের অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সংযোগব্যবস্থা, ক্লাউড ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে স্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের দক্ষতা বৃদ্ধি, নতুন সেবা উদ্ভাবন এবং বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি ডিজিটাল প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি। হুয়াওয়ে প্রেসিডেন্ট বলেন, এ দেশে শিল্প এবং জ্বালানি খাতে এআই ব্যবহার করা গেলে পরিচালন ব্যয় অনেক কমে আসবে। এই ক্ষেত্রে হুয়াওয়ে প্রযুক্তি সহযোগিতা দিতে পারে।
সম্মেলনে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের যুগ্ম সচিব সাইদা আফরোজ মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। অনুষ্ঠানে ‘ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি ও কানেক্টিভিটি’, ‘শিল্পখাতে দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রযুক্তির ভূমিকা’ এবং ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: বৈশ্বিক প্রবণতা, প্রভাব ও বাংলাদেশের প্রস্তুতি’ শীর্ষক তিনটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
সাইদা আফরোজ বলেন, বাংলাদেশে মোবাইল নেটওয়ার্কের ৯৯ শতাংশ এখন ফোরজি প্রযুক্তির আওতায়। কিন্তু এই ফোরজির মোবাইল ডিভাইস আছে ৪৬ শতাংশ গ্রাহকের। যার কারণে একটি বিশাল সংখ্যক গ্রাহক এই প্রযুক্তির সুবিধা নিতে পারছে না। তিনি সরকারের ২০৩৫ সাল পর্যন্ত টেলিকম ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের পরিকল্পনা জানান।
‘ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি ও কানেক্টিভিটি’, ‘শিল্পখাতে দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রযুক্তির ভূমিকা’ এবং ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: বৈশ্বিক প্রবণতা, প্রভাব ও বাংলাদেশের প্রস্তুতি’ শীর্ষক আলোচনায় ফাইভজি ও সংযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, প্রযুক্তির মাধ্যমে শিল্পখাতের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারে বাংলাদেশের প্রস্তুতির বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। তৈরি পোশাকশিল্প, বন্দর, কৃষি ও স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন খাতে ফাইভ-জি, ফিক্সড ওয়্যারলেস অ্যাকসেস এবং এন্টারপ্রাইজ কানেক্টিভিটির বাণিজ্যিক সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়।
প্যানেল আলোচনায় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন—বিটিআরসির কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ইকবাল আহমেদ বলেন, নীতি এবং প্রযুক্তির অবকাঠামো হতে হবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে। অর্থাৎ, জনসংখ্যা এবং আর্থসামাজিক অবস্থা বিবেচনা করে প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ করতে হবে।
রবির চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলম বলেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগে অনেক চ্যালেঞ্জ আছে। ১৫ বছর আগে ইনফ্রাস্ট্রাকচার শেয়ারিং গাইডলাইন হয়েছে। গত ১৫ বছরে তা বাস্তবায়ন হয়নি। দ্বিতীয়ত, দেশে কম্পিটিশন আইন আছে। কিন্তু এই আইন প্রয়োগে সরকারের শক্ত ভূমিকা দেখা যায় না। যার কারণে গ্রাহকরা যৌক্তিক সেবা পাচ্ছেন না।
আলোচনায় সঞ্চালনা করেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সৈয়দা নওশিন পর্ণিনী এবং জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সির মহাপরিচালক ড. মো. তৈয়বুর রহমান। প্যানেলিস্ট হিসেবে অংশগ্রহণ করেন টেলিযোগাযোগ, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) এবং প্রযুক্তিশিল্পের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
এসব আলোচনায় বাংলাদেশে ফাইভ-জি ও সংযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, প্রযুক্তির মাধ্যমে শিল্পখাতের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের প্রস্তুতির বিষয়গুলো উঠে আসে। পাশাপাশি তৈরি পোশাকশিল্প (আরএমজি), বন্দর, কৃষি ও স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন খাতে ফাইভজি, ফিক্সড ওয়্যারলেস অ্যাকসেস (এফডব্লিউএ) এবং এন্টারপ্রাইজ কানেক্টিভিটির বাণিজ্যিক সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়।
এ ছাড়া ক্লাউড কম্পিউটিং, অটোমেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নিরাপত্তাব্যবস্থা ও স্মার্ট প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, অপারেটিং খরচ কমানো এবং সরকারি সেবার মান উন্নয়নের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিষয়ক আলোচনায় ব্যাংকিং, উৎপাদন, পণ্য পরিবহন ও সরবরাহ এবং সরকারি সেবায় প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে নির্ভরযোগ্য ক্লাউড অবকাঠামো, প্রয়োজনীয় তথ্যের প্রস্তুতি, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা এবং সহায়ক নীতিমালার গুরুত্ব তুলে ধরেন বক্তারা।
এআই-নির্ভর সেবাখাত নিয়ে প্রদর্শনী
দিন বদলে গেছে। এখন আর ৫/১০ কিলোমিটার হেঁটে ভালো স্কুলে যেতে হবে না। দূরবর্তী স্কুলে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থায় আধুনিক শিক্ষা নেওয়া যাবে। সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কী নেই, সব থাকবে। এমন একটি স্মার্ট স্কুলের মডেল প্রদর্শনী করা হলো এই সম্মেলনে। সেখানে হুয়াওয়ের কর্মকর্তারা জানান, ছাত্রছাত্রী টাঙ্গাইল বা রাজশাহী যেখানেই থাকুক, বড় পর্দার মাধ্যমে তাকে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে যোগাযোগ করে শিক্ষা বা ক্লাস নেওয়া যাবে। এ জন্য এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। এই প্রযুক্তি শিক্ষার্থীদের চাহিদা অনুযায়ী ক্লাসরুম সাজাতে পারবে।
সবুজ জ্বালানি নিয়েও একটি স্টলে প্রদর্শনীর আয়োজন করে হুয়াওয়ে। এই প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার এমডি ইশতিয়াক আহমেদ যুগান্তরকে জানান, লোডশেডিংমুক্ত দেশ গড়তে সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তাই হুয়াওয়ে বাংলাদেশের জন্য সোলার প্যানেলের সবচেয়ে স্মার্ট কনভার্টার এবং লিথিয়াম ব্যাটারি স্টোরেজ নিয়ে এসেছে। তিনি বলেন, এই ব্যাটারি স্টোরেজ দিয়ে সৌরবিদ্যুতের পাশাপাশি গ্রিডের বিদ্যুৎও মজুত করা যাবে। এতে করে এই ব্যাটারি পাওয়ার সিস্টেম মাত্র সাড়ে চার বছরে বিনিয়োগ উসুল হয়ে যাবে। তিনি বলেন, সোলার প্যানেলে হুয়াওয়ের ইনভার্টার ব্যবহার করলে কোনো ধরনের দুর্ঘটনা ঘটবে না। আগুন লাগলে নিজে থেকেই পুরো সিস্টেম বন্ধ হয়ে যাবে।
‘স্মার্ট কানেকশন হাউস’ নামে একটি স্টলে হুয়াওয়ে দেখিয়েছে, কীভাবে এআই প্রযুক্তি এবং রোবট দিয়ে আধুনিক জীবনযাপন করা যায়। এমনকি সেই বাড়িতে কৃত্রিম বিড়াল বা পশুও রাখা হয়েছে।

-(8)-6ae0ac3220133.jpg)
-6ae37920cde57.jpg)
-6ae37945dce37.jpg)
-6ae37772e1228.jpg)
-6ae3782cacd29.jpg)