সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের পরিকল্পনা ও শিক্ষা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেছেন, প্রথমবার দেশের ব্যাংকিং খাতের সংস্কৃতি নষ্ট হয়েছে ঋণখেলাপির মাধ্যমে। দ্বিতীয়বার নষ্ট হয়েছে ব্যাংক লুটপাটের মাধ্যমে। কোনো নিয়মকানুন ছাড়া ব্যাংক থেকে টাকা লুট করে নিয়ে যাওয়া হয়। এ কারণেই আজ আর্থিক খাত এই খারাপ অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে।
রাজধানীর মিরপুরে বুধবার বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) আয়োজিত দুই দিনব্যাপী বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে এ কথা বলেন তিনি। এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ‘অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে ব্যাংকিং খাতের পুনর্গঠন’।
ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ১৯৮০ ও ’৯০-এর দশকের উদারীকরণ এবং বেসরকারি খাতে ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই আমরা নানা বিতর্ক ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। ২০১০ সালের পর কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই ‘দলে দলে’ নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়ার কারণেই সেগুলো দেউলিয়া হয়ে পড়ে। কিছু ব্যাংক সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আমানত গ্রহণ করেছিল। শিক্ষকদের বেতন-ভাতা, কল্যাণ তহবিল ও পেনশনের তহবিল নিয়ে তারা ব্যাংক খুলেছে। দরিদ্র শিক্ষক ও এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের কোটি কোটি টাকার পেনশন ও কল্যাণ তহবিল আটকে পড়ে। সেই তহবিলের টাকা এখনো আটকে আছে।
তিনি আরও বলেন, উপযুক্ত নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামো তৈরি না করেই বেসরকারি খাতে ব্যাংক প্রতিষ্ঠার অনুমতি দেওয়ার পরিণতি কী হয়েছিল, তা এখন সবাই দেখছে। উদ্যোক্তা পরিচালকরা সংশ্লিষ্ট ব্যাংক থেকে মোট আমানতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ঋণ হিসাবে তুলে নিয়েছিলেন। অনুমতি দেওয়ার আগে একটি গোষ্ঠী বা পরিবার একাধিক ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে কি-না, এ বিষয়ে নিয়ম থাকা দরকার ছিল, যা ‘অ্যান্টি-ট্রাস্ট’ আইনের আওতায় আসা উচিত।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর দীর্ঘমেয়াদি সংকটের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, অতীতে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর অবস্থার উন্নতি হলেও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সংস্কার বারবার ব্যর্থ হয়েছে। রাজনৈতিক সরকারগুলোর ‘পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতি’ বা রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো অন্যায় সুযোগ বিতরণের কেন্দ্র হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থনীতির হৃৎপিণ্ডতুল্য এই আর্থিক খাতকে রাজনৈতিক প্রভাব ও পৃষ্ঠপোষকতার বাইরে রাখতে রাজনৈতিক সদিচ্ছার বিকল্প নেই।
ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের মতে, বর্তমানে অর্থনীতির শ্লথগতি এবং ব্যাংক ও শিল্প খাতের তারল্যসংকট থেকে উত্তরণে অনেকেই নিয়মকানুন শিথিল করার কথা বলছেন। অতীতে বিধিবিধান অতিরিক্ত শিথিল করার কারণেই বর্তমান সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। অসাধারণ পরিস্থিতিতে অসাধারণ পদক্ষেপ নিতে হয়। তাই সংকট উত্তরণে নিয়ম কিছুটা শিথিল করা হলেও তা যেন পুনরায় লুটপাট বা অনিয়মের সুযোগ তৈরি না করে, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত সুরক্ষাকবচ বা ‘সেফগার্ড’ নিশ্চিত করতে হবে। সৎ ও প্রকৃত উদ্যোক্তাদের খুঁজে বের করে তাদেরই সহায়তা দিতে হবে।
বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. এজাজুল ইসলামের সভাপতিত্বে সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) চেয়ারম্যান ড. জায়েদী সাত্তার। আরও বক্তৃতা করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর মো. কবির আহম্মদ, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সভাপতি আবদুল হাই সরকার, বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান অঞ্চলের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেম এবং ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান মাসরুর আরেফিন।
মূল প্রবন্ধে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) চেয়ারম্যান ড. জায়েদী সাত্তার বলেন, রাজস্ব ও মুদ্রা কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। কারণ, উভয়ের সিদ্ধান্ত সামগ্রিক চাহিদা, সুদের হার, ঋণপ্রবাহ এবং বহিঃখাতের স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করে। তবে এই সমন্বয়ের ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেন রাজস্বনীতির অর্থায়নের শেষ ভরসায় পরিণত না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
ড. এজাজুল ইসলাম বলেন, ‘ব্যাংকিং ব্যবস্থার মূল ভিত্তিই হলো আস্থা। আস্থা না থাকলে সঞ্চয়কে দক্ষতার সঙ্গে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে রূপান্তর করা সম্ভব নয়।’ ব্যাংকিং খাতের জন্য বাস্তবসম্মত, বিশ্বাসযোগ্য ও ভারসাম্যপূর্ণ সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি কয়েকটি অগ্রাধিকার তুলে ধরেন। এগুলো হলো-করপোরেট সুশাসন জোরদার, সম্পদের গুণগত মান ও মূলধনের পর্যাপ্ততা উন্নত করা, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি এবং ব্যাংক পুনর্গঠন ও নিষ্পত্তি কার্যক্রম আরও কার্যকর করা এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ।


-6ae37920cde57.jpg)
-6ae37945dce37.jpg)
-6ae37772e1228.jpg)
-6ae3782cacd29.jpg)