কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরের প্রত্যন্ত হাওড় জনপদে শিক্ষা বিস্তারের বাতিঘর বাহেরবালি উচ্চবিদ্যালয়। বিদ্যালয়টি দূর থেকে দেখলে মনে হবে, দিগন্তবিস্তৃত জলরাশির মাঝখানে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক বিশালাকৃতির জাহাজ। ইঞ্জিনচালিত নৌকায় দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে যেতে হয় বিদ্যালয়টিতে। বিকাল ৪টা পর্যন্ত বিরামহীন ক্লাস থাকলেও নেই কোনো বিনোদন ও স্কুল ফিডিং (মিড ডে মিল) ব্যবস্থা। তাছাড়া দীর্ঘ নৌপথে যাতায়াতে নিরাপত্তাসামগ্রী না থাকায় ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করে শিক্ষার্থীরা।
জানা গেল, দীর্ঘদিন এ বিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীরা এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিলেও রয়েছে শুধু অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত এমপিওভুক্তি। এ কারণে এটি এখনো পূর্ণাঙ্গ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে রূপ নিতে পারেনি। শিক্ষকরা দশম শ্রেণি পর্যন্ত জাতীয়করণের দাবি জানিয়েছেন। বিগত এসএসসি পরীক্ষায় ৭১ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে ৫৪ জন পাশ করেছে স্কুলটিতে। পাশের হার ৭৬ দশমিক ০৬ শতাংশ।
উপজেলার মাইজ চর ইউনিয়নের গভীর হাওড়ের মাঝপথে ২০১১ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন এসইএসডিপির (সেকেন্ডারি এডুকেশন সেক্টর ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট) আওতায় প্রতিষ্ঠিত হয় স্কুলটি। ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে পাঠদান ও স্বীকৃতি মেলে এবং ২০১৭ সালের জুলাইয়ে নিম্নমাধ্যমিক স্কুল (অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত) হিসাবে এমপিওভুক্ত হয়। পরে নবম ও দশম শ্রেণির পাঠদান ও স্বীকৃতি মিললেও এমপিওভুক্তি হয়নি।
বিদ্যালয়টিতে উপজেলার মাইজচর ইউনিয়নের আয়নারগোপ, পুরাকান্দা, পারকচুয়া, বোয়ালী, শিবপুর গ্রামসহ এ হাওড় জনপদের সাড়ে তিনশর বেশি শিক্ষার্থী লেখাপড়া করছে। দুটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা পালাক্রমে বিভিন্ন গ্রাম থেকে শিক্ষার্থীদের নিয়ে আসে। আর শুকনো মৌসুমের তিন মাস উঁচুনিচু পথে হেঁটে স্কুলে আসে শিক্ষার্থীরা। বিদ্যালয়টিতে রয়েছেন ১০ জন শিক্ষক ও তিনজন কর্মচরী।
নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী মুকুল রাণী দাসের দাবি, এ স্কুলে ভালো পড়াশোনা হয়। সপ্তাহের বৃহস্পতিবার ৫টা ক্লাসের পর হাম-নাত-গজল-গানসহ সাংস্কৃতিক শিক্ষা দেওয়ায় হয়। আর বাইরে কোচিং ও প্রাইভেট পড়তে হয় না। সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী নদী আখতার বলে, বছরের ৯ মাসই গভীর হাওড়ের থইথই পানিতে জাহাজের মতো ভাসমান থাকে স্কুলটি। এজন্য ঝড়বৃষ্টি উপেক্ষা করে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় স্কুলে যাতায়াত করতে হয়। কিন্তু নৌকায় লাইফজ্যাকেট ও অন্যান্য জীবন রক্ষাকারী সামগ্রী না থাকায় আতঙ্ক কাজ করে।
ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী মোহাম্মদ হানজেলা বলে, ‘আমরা সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত বলতে গেলে বন্দিদশার মতো লেখাপড়া করি। বাড়ি থেকে খাবার আনার সুযোগ থাকে না। তাই মধ্যহ্নবিরতির সময় প্রচণ্ড ক্ষুধা পায় আমাদের। এখানে খাবারের ব্যবস্থা নেই। মিড ডে মিল চালু হলে আমরা উপকৃত হব।’
মধ্যাহ্নবিরতির সময় আন্তঃস্কুল বিনোদনব্যবস্থার আওতায় ক্যারম, দাবা, লুডু, টেবিল টেনিস প্রভৃতি খেলাধুলার ব্যবস্থা করার দাবি জানায় দশম শ্রেণির বাণিজ্য বিভাগের শিক্ষার্থী রহিমা আখতার।
বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক পিপন চন্দ্র দাস বলেন, বিদ্যালয়টিতে বিজ্ঞানাগার থাকলেও নেই বিজ্ঞান শিক্ষক। এছাড়া মাল্টিমিডিয়া সরঞ্জামাদিও নেই। তিনি এসব সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। কিশোরগঞ্জ জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শামসুন্নাহার মাকছুদা জানিয়েছেন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দাবিদাওয়া বাস্তবায়নের চেষ্টা চালাবেন তিনি।


-6ae37920cde57.jpg)
-6ae37945dce37.jpg)
-6ae37772e1228.jpg)
-6ae3782cacd29.jpg)