চট্টগ্রামে মোটরসাইকেল দিয়ে সড়কে ব্যারিকেড সৃষ্টি করে ট্রাক থামিয়ে ৩০ হাজার ইয়াবা লুটের যে অভিযোগ উঠেছে, তাতে সাতকানিয়া থানার কয়েকজন পুলিশ ও তাদের সোর্সই জড়িত। সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানে এমনটাই জানা গেছে। এ সংক্রান্ত দুটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে।
শনিবার রাতে লোহাগাড়ার পুটিবিলা ইউনিয়নের এম চর হাটসংলগ্ন একটি সড়কে ট্রাক থামানোর পর কথিত সোর্স রবিন ও মোমেনের মাধ্যমে কনস্টেবল ফয়েজ আহম্মদ ও গাজী মো. মহসিন সামনের সিটে বসে ট্রাক নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেন।
দুটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে কনস্টেবল ফয়েজ আহম্মদকে ট্রাকের সামনে এবং মহসিনকে চালকের পাশে অবস্থান করতে দেখা গেছে। তবে তারা মাস্ক পরিহিত ছিলেন। পরে থানার একাধিক উপপরিদর্শক, সহকারী উপপরিদর্শক ও কনস্টেবল তাদের শনাক্ত করেন। রাত সাড়ে ১১টার দিকে তারা দুজনেই কথিত সোর্স রবিন ও মোমেনের মাধ্যমে ট্রাকটি সাতকানিয়ার কেরানীহাট লেভেল ক্রসিংসংলগ্ন এলপিজি পাম্প স্টেশনে আনার পর ব্যাপক তল্লাশি করে ৩০ হাজার ইয়াবা সরিয়ে ফেলেন।
ট্রাকটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পুরো কার্যক্রম তদারকি করেন থানার উপপরিদর্শক (এসআই) এসএম মাহবুবুল ইসলাম। ওই সময় তিনি থানার কম্পিউটার অপারেটর ও কনস্টেবল প্রীতম সাহাকে সঙ্গে নিয়ে যান। থানাসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, বিষয়টি নজরে আসার পর এ ব্যাপারে পুলিশের অভ্যন্তরীণ তদন্ত এবং সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদও করেছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, শনিবার দুপুরে কক্সবাজারের চকরিয়ার ইসলামনগরে একটি মিনিট্রাক সড়কের পাশে রেখে হোটেলে খাবার খাচ্ছিলেন চালক নাছির। সেখানে পুলিশের কথিত সোর্স রবিন ও মোমেনের সঙ্গে তার দেখা হয়।
পরে নাছির মাতামুহুরী নদীর সেতুসংলগ্ন একটি পাম্প স্টেশন থেকে জ্বালানি নিয়ে বান্দরবানের লামার উদ্দেশে রওয়ানা হন। সেখানে পৌঁছে তিনি এক মাদক বহনকারীর কাছ থেকে ৩০ হাজার ইয়াবা সংগ্রহ করেন। সেগুলো ট্রাকের চালকের আসনের নিচে তৈরি করা বিশেষ জায়গায় লুকিয়ে রাখেন। এরপর তিনি খালি ট্রাকে সবজি বোঝাই করার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন।
চালক নাছির গন্তব্যে পৌঁছানোর কিছু দূর আগে থেকে একটি লাল রঙের মোটরসাইকেল ও একটি নোহা গাড়ি নিয়ে রবিন, মোমেন এবং কনস্টেবল ফয়েজ ও মহসিন ট্রাকের পিছু নেন। একপর্যায়ে নির্জন স্থানে পৌঁছালে রবিন ও কনস্টেবল ফয়েজ মোটরসাইকেল দিয়ে সড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে ট্রাকটি থামান। এরপর কনস্টেবল মহসিন ট্রাকের জানালা খুলে চালকের পাশের আসনে বসেন এবং নাছিরকে হাতকড়া পরিয়ে দেন। পরে কনস্টেবল ফয়েজও চালকের পাশের আসনে বসেন।
এরপর তারা ট্রাকটি একটি এলপিজি পাম্প স্টেশনে নিয়ে চালককে ট্রাক থেকে নামিয়ে তল্লাশি করেন। এ সময় তারা লুকিয়ে রাখা ৩০ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করে নিজেদের হেফাজতে নেন। পরে এসআই মাহবুব মোটরসাইকেল নিয়ে পৌঁছালে ঘটনাস্থলে থাকা অন্যরা ট্রাকের চাবি ও চালককে তার জিম্মায় দিয়ে সরে যান। পরে এসআই মাহবুব ট্রাকচালক নাছিরকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং চড়থাপ্পড় মারেন।
পরবর্তী সময়ে এসআই মাহবুব পুরো বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার উদ্দেশ্যে ট্রাক আটকে রাখার খবর থানায় জানিয়ে আরও দুই পুলিশ সদস্য ঘটনাস্থলে নিয়ে আসেন। তবে এরই মধ্যে ট্রাকটিতে তল্লাশি চালানো হয়েছে বলে জানতে পেরে তারা দুজনেই সেখান থেকে চলে যান। পরে এসআই মাহবুব চালক নাছিরের কাছ থেকে ঘটনার বিষয়ে মোবাইল ফোনে একটি ভিডিও ধারণ করে চালক ও ট্রাকটি ছেড়ে দেন। এর পরপরই ট্রাকের চালক চট্টগ্রাম নগরীর উদ্দেশে যাত্রা করেন।
ট্রাকচালক নাছির বলেন, আমি লামা থেকে লোহাগাড়া আসার পথে ফকিরহাট পৌঁছালে রবিন ও কনস্টেবল ফয়েজ মোটরসাইকেল দিয়ে আমার ট্রাকের গতিরোধ করেন। এরপর এক পুলিশ সদস্য ট্রাকের সামনের সিটে উঠে আমার এক হাতে হাতকড়া পরিয়ে দেন। কিছুক্ষণ পর কনস্টেবল ফয়েজও ট্রাকে ওঠেন। এ সময় তারা ট্রাকে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরার তার ছিঁড়ে ফেলেন।
পরে তারা আমাকে লোহাগাড়া ট্রাফিক পুলিশ বক্সে নিয়ে তাদের সাইট না দেওয়ার অভিযোগ তুলে ট্রাফিক আইনে একটি মামলা দেওয়ার কথা বলেন। এরপর ফোনে কথা বলে আমাকে আবার সাতকানিয়ার ঠাকুরদিঘী পেট্রোল পাম্প এলাকায় নিয়ে আসেন। সেখানে রবিন ও মোমিনের মোটরসাইকেলের সঙ্গে অপর একটি মোটরসাইকেল নিয়ে আরও তিন যুবক যোগ দেন।
একপর্যায়ে আমাকে কেরানীহাট লেভেল ক্রসিংয়ের পর একটি এলপিজি পাম্পের নির্জন স্থানে নেওয়া হয়। এ সময় ফয়েজ, রবিন, মোমিনসহ অন্য পুলিশ সদস্য এবং তাদের সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা আমার ট্রাকে তল্লাশির নামে জিনিসপত্র এলোমেলো করেন। পরে ট্রাকের সিটের নিচে রাখা ৩০ হাজার ইয়াবা নিয়ে যান। এছাড়াও আমার ট্রাকের সিসিটিভি ক্যামেরার মেমোরি কার্ড ফরম্যাট করে দেওয়া হয়।
অভিযোগের বিষয়ে কনস্টেবল ফয়েজ আহম্মদ বলেন, এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। তাই আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেও কোনো লাভ হবে না। এ বিষয়ে আমি আপনাকে কিছু জানাতেও রাজি নই। কারণ, ঘটনার দিন রাতে আমি থানায় ছিলাম। এ বিষয়ে কিছু জানার থাকলে আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলুন।
অপর কনস্টেবল গাজী মো. মহসিন বলেন, আমি সেখানে ছিলাম না, তাই আমি এসব বিষয়ে কোনো ধরনের মন্তব্য করতে রাজি না।
থানার কম্পিউটার অপারেটর ও কনস্টেবল প্রীতম সাহা বলেন, ঘটনার দিন রাতে এসআই মাহবুব স্যারের দাঁতের চিকিৎসক দেখানোর জন্য আমি তার সঙ্গে লোহাগাড়া গিয়েছিলাম। সেখানে চিকিৎসককে না পেয়ে আমরা ফিরে আসি। পরে ঠাকুরদিঘী হয়ে কেরানীহাটে যাই। ওই সময় স্যারকে ফোনে সোর্সের সঙ্গে কথা বলতে শুনেছি। এর অনেকক্ষণ পর ট্রাকটি আটকানো হয়।
এদিকে সোর্স রবিনের ফোন নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। আর অপর সোর্স মোমিনের ফোন নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়।
থানার উপপরিদর্শক (এসআই) এসএম মাহবুবুল ইসলাম বলেন, সোর্সের তথ্যের ভিত্তিতে আমরা একটি ট্রাক থামিয়েছিলাম। পরে ট্রাকচালক আগেই তল্লাশি করা হয়েছে বলে জানালে আমি সোর্সকে বকাঝকা করার পর ট্রাকটিতে আর তল্লাশি না চালিয়ে চালকের ভিডিও নিয়ে ছেড়ে দিয়েছি।


-6ae37920cde57.jpg)
-6ae37945dce37.jpg)
-6ae37772e1228.jpg)
-6ae3782cacd29.jpg)